রাতের নির্জন চরে(সত্য ঘটনা)

আমি ইকবাল কবির। আমার বাড়ি টাঙ্গাইল। আমাদের বাড়ির পাশেই একটা বিল আছে। শুকনো মৌসুমে সেখানে বোরো ধানের চাষ হয়, আর বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকে। আমাদের গ্রাম থেকে যমুনা নদী পার হলে এনায়েতপুরের হাট।

# পর্ব ১:আজ যে ঘটনাটি শোনাবো, তা কোনো কল্পনা নয়, আমার নানার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি সত্যি ঘটনা। ঘটনার দিন নানা এনায়েতপুরের হাটে গিয়েছিলেন ‘মাঝধরা’ জাল কিনতে। ওখানকার হাটে নাকি খুব ভালো জাল পাওয়া যায়। সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে থালচার ঘাট পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে, সেখান থেকে নৌকায় করে হাটে পৌঁছান তিনি। জাল কিনে যখন আবার থালচার ঘাটে ফিরে এলেন, তখন মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেছে।

নৌকা থেকে নেমে সবাই একসাথেই হাঁটা শুরু করেছিলেন। কিন্তু বেশ কিছুটা পথ আসার পর সঙ্গীদের সাথে নানার পথ আলাদা হয়ে যায়, কারণ তাদের গন্তব্য ছিল ভিন্ন। সঙ্গীরা নানাকে রাতের বেলা একা যেতে বারণ করেছিল। কিন্তু নানা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন, “কোনো সমস্যা হবে না, আমি একাই চলে যেতে পারব।” তখন রাত আনুমানিক দশটার মতো বাজে। নানা একা নদীর চর ধরে হাঁটছেন। চারদিকে সুনসান নীরবতা।

### পর্ব ২: রহস্যময় সাদা ঘোড়া নদীতে তখন খুব একটা পানি ছিল না, মাঝে মাঝে ছোপ ছোপ পানি আর বোরো ধানের খেত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুক্ষণ হাঁটার পর নানা হঠাৎ দেখলেন, একটি সাদা ঘোড়া ধান খাচ্ছে। তিনি মনে মনে বিরক্ত হলেন। ভাবলেন, কে না কে ঘোড়া ছেড়ে রেখেছে, কৃষকের এতো কষ্টের ধান নষ্ট করছে! আরেকটু এগোতেই দেখলেন আরও দুটো ঘোড়া ঠিক একইভাবে ধান খাচ্ছে। নানার খুব রাগ হলো, কিন্তু রাতের বেলা একা মানুষ, তাই কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে যাওয়ার সময় তিনি একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন।

ঘোড়াগুলো মুখ দিয়ে ধান খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ধানের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না! ধানগাছগুলো আগের মতোই অক্ষত আছে। বিষয়টা দেখে নানার মনে একটু খটকা লাগল। তিনি পকেট থেকে একটা বিড়ি ধরিয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। তিনি জানতেন, আগুন দেখলে সাধারণত পশু-পাখি ভয় পায়। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, উল্টো ঘোড়াগুলো তার পেছন পেছন আসতে শুরু করেছে! এবার নানা সত্যিই ভয় পেয়ে গেলেন। চারদিকে নদীর নির্জন চর, কোথাও কোথাও গভীর পানি। সামনের গ্রামটাও বেশ খানিকটা দূরে, দৌড়ালেও পৌঁছাতে দশ-পনেরো মিনিট লাগবে। ঘোড়াগুলো যেন তার প্রাণ নেওয়ার জন্যই ছুটে আসছিল।

### পর্ব ৩: মানুষের কণ্ঠে অশুভ ছায়া নানার মনে তখন অজানা আতঙ্ক।

তিনি মনে মনে জানা সব দোয়া-দরুদ পড়তে লাগলেন আর প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করলেন। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ দূরে একটা আলোর ঝলকানি দেখতে পেলেন তিনি। বাঁচার আশায় সেই আলো লক্ষ্য করে আরও জোরে ছুটলেন। কাছে গিয়ে দেখলেন, সেটা একটা বেদেদের নৌকার কুপির আলো। নৌকার কাছাকাছি গিয়ে নানা চিৎকার করে সাহায্য চাইলেন। তার চিৎকার শুনে নৌকা থেকে এক লোক বেরিয়ে এসে দ্রুত নানাকে নৌকায় তুলে নিলেন।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘোড়াগুলো একেবারে নৌকার কাছে এসে দাঁড়াল! নানা দেখলেন, ঘোড়াগুলোর চোখগুলো আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে, আর তাদের চোখে-মুখে এক চরম রাগান্বিত ভাব। সবচেয়ে ভয়ের ঘটনাটি ঘটলো ঠিক তখনই। ঘোড়াগুলোর ভেতর থেকে স্পষ্ট মানুষের মতো কণ্ঠে আওয়াজ ভেসে এলো! তারা বেদে লোকটিকে ধমক দিয়ে বলল নানাকে পাড়ে নামিয়ে দিতে। কিন্তু লোকটি রাজি হলো না। বেশ কিছুক্ষণ ঐ অশুভ শক্তিগুলোর সাথে বেদে লোকটির বাকবিতণ্ডা চলে। একপর্যায়ে হার মেনে ঘোড়াগুলো সেখান থেকে চলে যায়। সে রাতে নানা ঐ বেদেদের নৌকাতেই ছিলেন। পরের দিন সকালে তিনি নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসেন। ভাই, নদীর চরে ঘটে যাওয়া এটি একটি শতভাগ সত্যি ঘটনা। আমার কাছে এমন আরও অনেক ভয়ংকর ঘটনা আছে, পরে সময় করে লিখে পাঠাবো। ভালো থাকবেন।

Was this helpful?
Be the first to write a review

Leave your comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *