দুবরাজপুরের অশুভ অমাবস্যা​(সত্য ঘটনার অবলম্বনে)

পর্ব ১: ঝড়ের পূর্বাভাস ও নির্জন রাস্তাঘটনা পাঠিয়েছেন, পায়েল দত্ত। ঘটনা টি ঘটেছে তার সাথে। ​বীরভূমের দুবরাজপুর শহরটা সন্ধ্যা নামলেই বেশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সেদিন ছিল এক অলক্ষুণে শনিবার। সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলাম, আবহাওয়া চমৎকার ছিল। মা নাস্তার জন্য ডাকতেই ঘরে গেলাম, তখনই টিউশন স্যারের ফোন।

​স্যার বললেন, “পায়েল, কালকের পড়াটা আজ বিকেলেই পড়াব। বিকেল সাড় পাঁচটা থেকে ছ’টা পর্যন্ত থাকবে।”​কথাটা শুনেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠল। তার মানে আজ ফিরতে ফিরতে নির্জন রাস্তায় অন্ধকার নেমে যাবে!​স্কুল শেষে আমি আর আমার বান্ধবী পূজা একসাথে স্যারের টিউশনে গেলাম। পড়া শেষ হতে হতে ঘড়িতে তখন সাড়ে ছয়টা।​বাইরে পা রাখতেই আমাদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল! বিকালের সেই নীল আকাশ এখন ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে।​বাতাসে ভিজে মাটির তীব্র গন্ধ আর সাথে এক অদ্ভুত ঠান্ডা হাওয়া। পুরো রাস্তা একদম জনশূন্য, যেন একটা মানুষও বেঁচে নেই।​”পূজা, তাড়াতাড়ি চালা! বৃষ্টি নামলে বিপদ হবে,”—আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম।​আমরা নির্জন ফাঁকা রাস্তা দিয়ে দ্রুত সাইকেল চালাচ্ছিলাম।

কিন্তু মাঝরাস্তায় পৌঁছাতেই একটা বিকট শব্দ হলো—মড়মড়… খট!প্যাডেলটা পুরো পুরো আলগা হয়ে গেল। ফাঁকা মাঠের মাঝখানে, কোনো আলো ছাড়া রাস্তায় আমাদের সাইকেলের চেইনটা খুলে গেল!​চারপাশে কুচকুচে অন্ধকার। পূজা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে চেইনটা লাগানোর চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু তেল আর কাদায় হাত পিছলে যাচ্ছিল।​ঠিক সেই মুহূর্তে, নিঃশব্দ অন্ধকারের মধ্য থেকে আমাদের একদম ঘাড়ের ওপর ভেসে এল এক ঠাণ্ডা শাঁসালো কণ্ঠস্বর—​”কী হয়েছে রে খুকি? সাইকেলের চেইনটা উঠছে না?”​আওয়াজটা এতটাই কাছে ছিল যে আমাদের কানে ঠান্ডা বাতাস এসে লাগল!

​​পর্ব ২: নিঃশব্দ ছায়া​আতঙ্কে আমাদের শরীরের রক্ত যেন জমে জল হয়ে গেল! আমরা ধড়ফড় করে পেছনে তাকালাম।​আমাদের ঠিক দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। পরনে একটা মলিন সাদা থান শাড়ি, মাথার চুলগুলো ধবধবে সাদা। কিন্তু সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয়—এই নিঝুম রাতে, এই ফাঁকা মাঠে কোনো বাড়িঘর নেই। উনি এলেন কোত্থেকে?​উনার গায়ের চামড়া কেমন যেন ফ্যাকাসে, আর চোখের দৃষ্টি একদম স্থির।​আকাশে বিকট শব্দে বাজ পড়ল। সেই আলোয় দেখলাম, বৃদ্ধা কোনো কথা বলছেন না, শুধু হাঁ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।​আমরা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালাম না। চেইন না লাগিয়েই সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে দৌড়াতে লাগলাম।​কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর পূজা থমকে গেল।​আমরা যত জোরে হাঁটছি, সেই বৃদ্ধাও ঠিক ততটাই দ্রুত আমাদের পেছনে পেছনে আসছেন!

সবচেয়ে ভয়ের বিষয়—কাদা রাস্তায় আমাদের পায়ের শব্দ হচ্ছে, কিন্তু ওই ৮০ বছরের বৃদ্ধার পায়ের কোনো শব্দ নেই!​হঠাৎ বৃদ্ধা একটু সামনে ঝুঁকে বিকৃত নিচু গলায় পূজাকে বললেন—​”তুই ওটার লোহা ধরে হাঁটছিস কেন রে? সাইকেলটা ছাড়… আমার পাশে আয়।”​কথাটা শুনে আমার মাথার ভেতরের স্মৃতির ঘণ্টা বেজে উঠল!​আমার বাবার বলা একটা কথা মনে পড়ে গেল—“অশুভ আত্মা বা অপশক্তি কখনো লোহার কাছে আসতে পারে না। লোহা জিনিসটাকে তারা ভীষণ ভয় পায়।”

বৃদ্ধা কিন্তু সাইকেলটার খুব কাছে আসছে না! উনি পূজাকে সাইকেলটা ছেড়ে উনার দিকে যেতে বলছেন!​আমি পূজার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বিড়বিড় করে বললাম, “পূজা, খবরদার! সাইকেলের হ্যান্ডেল ভুলেও ছাড়বি না!”​

​​পর্ব ৩: অশুভ পরিণতি ও রাতের আতঙ্ক​বৃদ্ধার মুখটা রাগে ও ক্ষোভে বিকৃত হয়ে গেল। বাতাস থেকে ভেসে আসতে লাগল পচা পুকুরের পানির মতো আঁশটে গন্ধ।​পূজা ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে সাইকেলের লোহাটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে রাখল। আমরা জীবনের শেষ শক্তি দিয়ে সামনের দিকে দৌড়াতে লাগলাম।​পেছনের সেই ধবধবে সাদা ছায়াটা প্রায় আমাদের গায়ের ওপর এসে পড়ছিল, ঠিক তখনই সামনে দেখা গেল আমাদের পাড়ার প্রবেশপথ!​আর সেই প্রবেশপথেই দাঁড়িয়ে আছে বহু পুরনো কালী মন্দির।​মা কালীর মন্দিরের সামনে পৌঁছাতেই হঠাৎ চারপাশের সেই ভারী বাতাসটা হালকা হয়ে গেল।​আমি বুক কাঁপিয়ে পেছনে তাকালাম।​

সোজা ফাঁকা রাস্তা, কোথাও আড়াল হওয়ার মতো জঙ্গল বা দেয়াল নেই। কিন্তু সেই বৃদ্ধা… একদম গায়েব! এক সেকেন্ডের মধ্যে রাস্তাটা পুরো ফাঁকা!​আমরা সোজা বাড়ি গিয়ে শক্ত করে দরজা আটকে দিলাম। হাপাতে হাপাতে বাবাকে সব কথা বলতেই বাবার মুখ শুকিয়ে ছাই হয়ে গেল।​বাবা নিচু গলায় বললেন, “তোরা আজ মা কালীর কৃপায় আর সাইকেলের ওই লোহাটার জন্যই বেঁচে ফিরেছিস রে পায়েল। আজ অমাবস্যার শনিবার… ১০ বছর আগে এই দিনেই ওই নির্জন রাস্তায় এক বৃদ্ধা এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিলেন। আজও অমাবস্যায় উনি একা কাউকে পেলে আর ফিরতে দেন না।”এমন গল্প প্রতিদিন পেতে এখনই ফেসবুক পেজটি Follow করুন।​কথাটা শুনে আমাদের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। ভাগ্যিস সাইকেলটা সাথে ছিল!​একদম সত্য ঘটনা। নাম : পায়েল দত্ত ঠিকানা : বীরভূমের দুবরাজপুর, সমাপ্ত ঘটনা ভালো লাগলে। লাইক কমেন্ট ফলো করবেন 🤍

Was this helpful?
Be the first to write a review

Leave your comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *