এরশাদ শিকদার (সত্য ঘটনা)
Prologue: খুলনার বরফ কলের সেই ভয়ংকর রাতবাংলাদেশের খুলনা জেলার একটা ছোট্ট বরফ কল। সারাদিন সেখানে মানুষের কোলাহল, আর সন্ধ্যা নামতেই নিস্তব্ধতা। অল্প আলোয় গায়ে কাঁটা দেওয়া এই রকম একটা ভৌতিক পরিবেশে শুধু একটা ঘর থেকে মানুষের আত্মচিৎকার ভেসে আসছে। কিন্তু খুলনার ঘাট এলাকার এই ছোট্ট বরফ কলের চার দেওয়ালের ভেতরেই চাপা পড়ে যাচ্ছে সেই গগনবিদারী আর্তনাদ। হাত-পা বাঁধা হতভাগ্য এক যুবকের পা চেপে ধরে রেখেছে এক ব্যক্তি। আরেকজন বড় একটা হাতুড়ি দিয়ে পায়ের উপর পিটিয়ে যাচ্ছে অবিরাম। তার পা টা রীতিমতো থেতলে গেছে, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে দুই পায়ের হাড়গোড়।এরপর হাতুড়িটা রেখে ওই মানুষরূপী দানবটা ধীরে-সুস্থে একটা দড়ি তুলে নেয় এবং তারপর ওই দড়িটাকে ওই রক্তাক্ত যুবকের গলায় পেঁচিয়ে সজরে টান দেয়। যুবকটির নড়াচড়া তখন একেবারে বন্ধ, নাক-মুখ এমনকি চোখ দিয়েও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, জিভ একটু বেরিয়ে পড়েছে। এই অবস্থাতেও ওই মানুষরূপী দানবটা মৃত যুবকের নাকের কাছে হাত রেখে নিশ্চিত হয় যে আর প্রাণ নেই। এরপরেও সে ঠান্ডা হয় না! হঠাৎ করেই মেঝের উপর পড়ে থাকা যুবকটির মৃতদেহের বুকের উপর উঠে লাফাতে শুরু করে এবং বুকের উপর উঠে এইভাবে লাফানোর ফলে ওই ছেলেটির পাজর ভাঙার মর্মর আওয়াজ পর্যন্ত শোনা যায়—তখন সে শান্ত হয়। এরপর বড় একবালতি দুধ দিয়ে স্নান করে সেই ব্যক্তি এবং ওই যুবকের লাশ জমাট বাঁধা একটা সিমেন্টের ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে তাকে ফেলে দেওয়া হয় ভৈরব নদে।
পর্ব ১: শৈশবের ট্রমা ও অভাবের তাড়নায় বদলে যাওয়া জীবনসাল ১৯৫৫। ঝালকাঠি জেলার নলচিঠি উপজেলার মাঝখানে একটা ছোট্ট গ্রাম—মাদারগুণা। এই গ্রামে জন্ম হয়েছিল এরশাদ শিকদারের। তার পরিবারের কন্ডিশন একেবারেই ভালো ছিল না। বাবা বন্দে আলী মিয়া একজন সাধারণ ভূমিহীন কৃষক, নিজের চাষের কোনো জমি নেই। অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করে কোনো রকমে সংসারটাকে টানেন। সংসারে এরশাদের একটা বড় ভাইও আছে, সেও বাবার সাথে টুকটাক কাজ করে ফ্যামিলিটাকে একটু ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করে। এভাবে বাবা আর বড় ভাইয়ের অল্প ইনকামেই দিন কাটত। কিন্তু এই সাধারণ সুখটুকু বেশিদিন টেকেনি। এরশাদের বয়স যখন মাত্র ১২ বছর, তখন তার লাইফে একটা বড়সড় ধাক্কা আসে; তার বাবা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মারা যান।বাবার এই হঠাৎ চলে যাওয়াতে পুরো ফ্যামিলি অথই জলে পড়ে যায়। এরশাদের মা বাধ্য হয়ে সংসারের হাল ধরেন এবং মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিচারিকার কাজ শুরু করেন। এদিকে এরশাদ ব্যস্ত এলাকায় ডানপিটে গিরি করতে—স্কুল পালানো তো বটেই, এর-ওর সাথে মারপিট, চুরি—এই করেই তার সময় কাটছে। আর প্রত্যেকদিন মায়ের কাছে তার নামের নালিশ আসছে। এর মধ্যেই একদিন এরশাদ এক ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হয়, সেদিন দুপুরবেলা স্কুল ফাঁকি দিয়ে এরশাদ একটু আগেই বাড়ি চলে আসে এবং বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতেই ভেতর থেকে কিছু অন্যরকম আওয়াজ শুনতে পায়। কৌতূহল সামলাতে না পেরে তাদের আধভাঙা ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়েই সে দেখে, তার নিজের মা এলাকার একজন প্রভাবশালী লোকের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় শুয়ে আছেন! ধারের টাকা পরিশোধ করতে না পারায়।
পর্ব ১ সমাপ্তি ও আগামী অংশের : মায়ের এই রূপ দেখার পর সেই মুহূর্তে এরশাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোতে কী চলছে তা কেউ বলতে পারবে না।এজন্যই হয়তো হয়ে উঠে নরপিশাচ। তবে এর অনেক বছর পর এই ফ্যামিলি বরিশাল ছেড়ে খুলনার ঘাট এলাকায় চলে আসে। নতুন জায়গায় এসেও তাদের সংগ্রাম থামেনি। মা মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেন, আর বড় ভাই কুলির কাজ করেন। এই হাড়ভাঙা খাটুনি দেখে ছোট্ট এরশাদ মনে মনে শপথ নেয়—সে কুলি বা মজুর হয়ে জীবন কাটাবে না, যেকোনো উপায়ে শর্টকাটে বড় কিছু হতে হবে!মাথার মধ্যে কোন ভূত চেপেছিল তার? খুলনার আন্ডারওয়ার্ল্ডে কীভাবে পা রাখল সে? জানতে হলে আর দেরি না করে এখনই চলে আসুন আমাদের পরবর্তী পর্বে!
পর্ব ২: ঘাট এলাকায় ‘রাঙা চোর’ থেকে উদীয়মান গ্যাংস্টারখুলনার ঘাটে এসে এরশাদ সাধারণ কুলি হওয়ার কথা ভাবেনি, তার টার্গেট ছিল বেশ বড়সড় কিছু। সে সোজা চলে যায় তৎকালীন কুলিদের লিডার কাসেম সরদারের কাছে এবং সবার প্রথমে তারই ডান হাত হয়ে কাজ শুরু করে। কাসেম সরদারের সব ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে সে আসলে একটা বড় সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। এই সময়টাতেই ক্রাইমের দুনিয়ায় তার হাতেখড়ি হয়। ঘাটে যেসব মালবোঝাই নৌকা আসত, সেখান থেকে ধান, গম আর তেল চুরি করা শুরু করে সে। এভাবে চুরির হাত বেশ পাকা হতে শুরু করে এবং চুরি করতে গিয়ে তাকে মাঝেমধ্যে ধরাও পড়তে হয়। আস্তে আস্তে পুরো এলাকায় চুর হিসেবে তার একটা নামডাক হয়ে যায়।ঘাটের বাকি কুলি বা লেবারদের গায়ের রং সাধারণত একটু চাপা বা কালো হতো, কিন্তু সেই তুলনায় এরশাদের গায়ের রং ছিল বেশ ফর্সা,ও সুদর্শন । এই কারণটাকে কাজে লাগিয়ে ঘাটের মানুষ তাকে একটা নতুন নাম দেয়—’রাঙাচোর‘। এরই মধ্যে ঘাটের পাওয়ার পলিটিক্স চেঞ্জ হয়ে যায়। কাসেম সরদারের জায়গায় নতুন কুলি সরদার হয়ে আসে আঞ্জু সরদার। চালাক এরশাদ বুঝে যায় কাসেম সরদারের ভ্যালু এখন শেষ, সে সাথে সাথে আঞ্জু সরদারের গ্রুপে জয়েন করে যায়। লোকমুখে শোনা যায়, আঞ্জু সরদারের যৌন পছন্দ নাকি একটু আলাদা ছিল এবং ফর্সা চেহারার কিশোর এরশাদের উপর নজর পড়ে তার। সে এরশাদকে নিজের লালসা মেটানোর কাজে ব্যবহার করে (তার সাথে s**x করে) এবং এর বদলে এরশাদ ঘাটে নিজের পাওয়ার বাড়াতে শুরু করে।বয়স বাড়ার সাথে সাথে এরশাদের লোভও বাড়তে থাকে। চুরির সামান্য টাকায় আর কতদিন চলে? চাই আরও বড় কিছু। এরপর ১৯৭৬ কিংবা ১৯৭৭ সালের দিকে এরশাদের নতুন সঙ্গী হয় একটা রামদা। এই রামদা নিয়ে ঘাট এলাকায় সে শুরু করে ডাকাতি আর ছিনতাই। তার মতো কিছু উশৃঙ্খল ছেলেকে সাথে নিয়ে নিজের একটা গ্যাংও বানিয়ে ফেলে সে। এই দলের সদস্যদের কাজ ছিল বার্জ-কার্গো থেকে পণ্য চুরি করে নদীতে লাফিয়ে পড়া। যখনই ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের কোনো চাপ আসত, সে ট্র্যাক চেঞ্জ করে ফেলত—রেললাইনের পাথর আর লোহার পাত উপড়ে চুরি করে বিক্রি করতে শুরু করত! অর্থাৎ নিজের পার্সোনাল চুরির গন্ডি পেরিয়ে সে এখন সরাসরি সরকারি প্রপার্টি নষ্ট করার মতো বড়সড় ক্রাইমে জড়িয়ে পড়ে।
পর্ব ২ সমাপ্তি ও আগামী অংশের: সাধারণ চুরি ও ট্রলারে চাঁদাবাজির পর গমের বস্তা পাচার আর সিমেন্টে বালি মেশানোর কাজ চলতে থাকে। এভাবে ঘাট এলাকায় নিজের একটা স্ট্রং পজিশন তৈরি করে নেয় সে। কিন্তু ছোটখাটো গ্যাংস্টার হয়ে কি তার লোভ থামার পাত্র? না! দেশজুড়ে তখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটছে।১৯৮২ সালের সামরিক শাসন কীভাবে বদলে দিল এরশাদ শিকদারের ভাগ্য? পলিটিক্যাল শিল্ড বা রাজনৈতিক ব্যাকআপ পেয়ে সে কীভাবে ত্রাস হয়ে উঠল? পড়তে থাকুন আমাদের পরবর্তী পর্ব!
পর্ব ৩: পলিটিক্যাল ব্যাকআপ এবং ওয়ার্ড কমিশনার এরশাদ শিকদারের রাজত্বসময়টা ১৯৮২ সাল। বাংলাদেশের পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন একটা বড় চেঞ্জ আসে, দেশের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেন সামরিক শাসক হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ। এই টাইমটাতে অপরাধ জগতের তরুণ এরশাদ শিকদার একটা অন্যরকম রিয়েলিটি বুঝতে পারে। সে অনুধাবন করে, শুধুমাত্র রাস্তায় ছোটখাট গ্যাং বা ডাকাতি চালিয়ে বেশিদূর যাওয়া পসিবল নয়; ক্রাইমের ওয়ার্ল্ডে রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং পুলিশের ঝামেলা থেকে বাঁচতে একটা শক্ত রাজনৈতিক ব্যাকআপ তার খুব প্রয়োজন। যেই ভাবা সেই কাজ—সে সোজা গিয়ে তৎকালীন সরকারি দল জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলে।জাতীয় পার্টিতে নাম লেখানোর পর খুলনার ঘাট এলাকায় এরশাদের পাওয়ার খুব দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে। যেকোনো পলিটিক্যাল পার্টির বড় বড় মিটিং বা সমাবেশের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার হয় জনবল তথা মানুষের ভিড়। যত বেশি পাবলিক আসে, পলিটিক্যালি সেই পার্টিকে তত বেশি পাওয়ারফুল মনে করা হয়। আর এই মানুষ সাপ্লাই দেওয়ার কাজে এরশাদ শিকদার ছিল একদম ওস্তাদ! ঘাটের সাধারণ লেবার আর কুলিরা এরশাদকে যমের মতো ভয় পেত, আর এই ভয়টাকে সে নিজের ব্যবসার মতো ইউজ করত। মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিসে সে দুই থেকে তিন হাজার মানুষ লাইনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারত। নেতারাই নিজেদের স্বার্থে তাকে কোলে তুলে নেন এবং তার সমস্ত অন্যায় ও ক্রাইমের পেছনে একটা শক্ত রাজনৈতিক দেয়াল ব্যাকআপ দেওয়া শুরু করেন।এই চরম ক্ষমতার সাপোর্ট পেয়েই এরশাদ শিকদার খুলনায় তার আসল দখলের রাজত্ব শুরু করে। সে একের পর এক সাধারণ মানুষের জমি আর প্রপার্টি গায়ের জোরে কবজা করতে থাকে। পাশাপাশি সে অবৈধ ড্রাগ বা মাদকের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে এবং কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যায়। এরপর ১৯৮৮ সালে সে অন্য নেতাদের পেছনে ঘুরে টাইম লস না করে নিজেই ডিরেক্ট ক্ষমতার চেয়ারে বসার প্ল্যান করে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের একটা লোকাল ইলেকশনে সে প্রার্থী হয়ে দাঁড়ায় এবং গায়ের জোরে ও কারচুপি করে খুলনার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কমিশনার হয়ে যায়! কমিশনারের পাওয়ার হাতে আসার পর তার ক্রাইমের স্পিড ও ক্ষমতা দুটোই ডাবল হয়ে যায়। সে চারপাশে বিরাট একটা বস্তি বানিয়ে সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গরিব হোমলেস মানুষকে থাকার জায়গা করে দেয়। এই বস্তিবাসীদের ব্লাইন্ড সাপোর্ট এবং কমিশনারের সরকারি পাওয়ার—এই দুটোকে মিক্স করে এরশাদ শিকদার খুলনার এমন এক অপরাজেয় মনস্টার হয়ে ওঠে যাকে টাচ করার ক্ষমতা স্বয়ং সরকারেরও ছিল না!
পর্ব ৩ সমাপ্তি ও আগামী অংশের আমন্ত্রণ: আইনের চেয়েও নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করা এরশাদের সামনে যারাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদেরই নেমে এসেছে ভয় পরিণতি। নাইটগার্ড ইনসাফ, কামাল, খালেক কিংবা শাহজাহান—কাউকেই সে ছাড়েনি। বরফ কলের ভেতরের সিক্রেট রুম আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে তখন শুধু মৃত্যুর মিছিল।খুনি এরশাদ কি এভাবেই চিরকাল ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে? তার এই সাম্রাজ্যে কি ধস নামবে না? জানতে চোখ রাখুন আমাদের পরবর্তী পর্বে!
পর্ব ৪: বরফকলের অন্ধকূপ ও ভৈরব নদের অতলে লাশআইনের তোয়াক্কা না করে এরশাদ শিকদার একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকে। ইনসাফ, কামাল এবং খালেক নামের তিনজন নাইটগার্ড যখন তার চোরাচালানের মালামাল পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়, তখন তাদেরকে প্রভাতী স্কুলের পেছনে নিয়ে মাটিতে ফেলে বুকের উপর লাফিয়ে পাঁজড় ভেঙে ফেলা হয় এবং নাইলনের দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। সেই দৃশ্য নিজ চোখে দেখায় শাহজাহানকেও একই কায়দায় খুন করা হয়। মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় নান্টুকে প্রথমে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে পরে বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগ করে মারা হয়।একবার এরশাদের ছয় ব্যবসায়ী সহযোগী তার সাথে ব্যবসা করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিলে, সে তাদের বাড়িতে ইনভাইট করে পেটপুরে আপ্যায়ন করার পর বরবর কায়দায় খুন করে এবং ছটা লাশ সিমেন্টের বস্তায় ঢুকিয়ে ভৈরব নদে ডুবিয়ে দেয়। এদিকে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে, এরশাদ ইমোশন বাদ দিয়ে খুব দ্রুত দল বদলে বিএনপিতে যোগ দেয়। বিএনপির ক্ষমতার ছায়ায় এসে সে খুলনায় একটা বিশাল বরফ কল গায়ের জোরে কবজা করে নেয় এবং এই বরফ কলটাকে সে তার নিজের পার্সোনাল টর্চারের সেলে কনভার্ট করে ফেলে! এই কারখানার ভেতরে একটা সিক্রেট স্পেশাল রুম ছিল, যেখানে সে মদ ও জোয়ার আসর বসাতো এবং শহরের সমস্ত ইনফ্লুয়েন্সিয়াল মানুষদের ডেকে এনে নোংরা এন্টারটেইনমেন্টের ব্যবস্থা করত।তবে তার মূল রাইভেল ছিল পাশের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ লিডার মুসলিম উদ্দিন খান, যিনি ঘাটের উপর এরশাদের একচ্ছত্র রাজত্বকে ওপেনলি চ্যালেঞ্জ করে বসেন। দুই পক্ষের গ্যাং ওয়ারে রক্ত ঝরতে থাকে। অবশেষে ১৯৯৩ সালের রোজার সময় মুসলিমের উপর হামলা চালিয়ে তাকে খুন করে এরশাদ। এই মার্ডারের পর এরশাদের নামে মাস্টার কেস হলেও, সে শয়তানি বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের খুব কাছের ছেলে জয়নালকে খুন করে সেই দায় চাপিয়ে দেয় মূল কমপ্লেইনকারী বাবুলের ঘাড়ে! লোকমুখে রটে যায় যে সে প্রতি খুনের পর খাঁটি দুধ দিয়ে স্নান করত এবং তার বস্তির ভেতরে আফ্রিকান মাগুর মাছ চাষের একটা বড় হাউস ছিল, যেখানে মানুষ খুন করে ফেলে দেওয়া হতো।
পর্ব ৪ সমাপ্তি ও আগামী অংশ: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এরশাদ দল বদলের চেষ্টা করলেও এবার আর ডাল গলেনি। পুলিশের খাতায় ৩০টিরও বেশি ক্রাইম রেকর্ড জমা হওয়ায় ১৯৯৮ সালে তাকে দল থেকে টার্মিনেট করা হয়। দল থেকে তাড়িয়ে দিলেও ব্ল্যাক মানি ও ক্ষমতার অহংকার তার কমেনি। স্বর্ণমল কী??
পর্ব ৫: রাজপ্রাসাদ ‘স্বর্ণকমল‘ এবং বিশ্বাসের পিঠে মরণঘাতী ছুরি১৯৯৮ সালে দল থেকে তাড়ানোর পরেও বড় বড় নেতাদের সাথে এরশাদের আন্ডারগ্রাউন্ড খাতির আগের মতোই ছিল। নিজের অঢেল ব্ল্যাক মানি শো-অফ করার জন্য সে ইন্ডিয়া থেকে টপ লেভেলের ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে এসে খুলনায় বানায় এক রাজকীয় প্রাসাদ—’স্বর্ণকমল’। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ শুধুমাত্র ওই বাড়িটাকে দেখার জন্য আসত। দেশ-বিদেশের দামি আসবাবপত্রে সাজানো এই বাড়ির ভেতরে বাংকারও ছিল। কিন্তু এই ড্রিম হাউজেও লেগেছিল মানুষের রক্ত! বাড়ি তৈরির দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ার ভুল করে মেজারমেন্টে জমির বাউন্ডারি এক ইঞ্চি এদিক-দদিক করায়, এরশাদের ডিকশনারিতে সেটা ছিল চরম অপরাধ। আর এই এক ইঞ্চি ভুলের জন্য সে ওই ইঞ্জিনিয়ারকে নির্মমভাবে খুন করে ফেলে!এদিকে এরশাদের অপরাধ জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয় তার সবচেয়ে কাছের মানুষ—নূর আলম। ইয়াং এজ থেকে ‘রাঙাচোর’ এরশাদের ছায়াসঙ্গী এবং রাইট হ্যান্ড ছিল নূর আলম। এরশাদের সব কায়দাকানুন, অবৈধ বিজনেস, টর্চার সেল আর পলিটিক্স নূর আলম এক হাতে হ্যান্ডেল করত, আর এরশাদও তাকে ব্লাইন্ডলি বিশ্বাস করত। কিন্তু এই খুন-খারাবি ও গ্যাংওয়ারের বাইরে এরশাদের সবচেয়ে বড় ডার্ক সাইড ছিল তার নারী আসক্তি। রাস্তায় যেকোনো মেয়েকে পছন্দ হলে সে তাকে তুলে আনতে দুবার ভাবতো না। এতদিন বাইরের মেয়েদের সাথে এসব ঘটলেও, ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ এরশাদ এবার নজর দেয় খোদ নূর আলমের নিজের স্ত্রীর উপর!নূর আলমকে কাজের বাহানায় বাইরে পাঠিয়ে সে তার স্ত্রীর সাথে ফিজিক্যাল রিলেশন (রে-*প) করে । লোকলজ্জা ও প্রাণের ভয়ে মেয়েটি কিছু বলতে পারেনি। কিন্তু একদিন হুট করে নূর আলম নিজেই নিজের ঘরের ভেতর এরশাদ আর তার স্ত্রীকে আপত্তিকর অবস্থায় হাতেমাতে ধরে ফেলে! যাকে জীবনের থেকেও বেশি ভরসা করেছিল, তার এমন বেইমানি নূর আলম স্বপ্নেও ভাবেনি। ক্ষমতার সামনে সে তখন এতটাই হেল্পলেস ছিল যে মুখ খোলার সাহসটুকু না পেয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে চলে যায়। তবে সেই দিন থেকেই তার মনের ভেতর এরশাদকে শেষ করার এক মারাত্মক আগুনের জন্ম হয়।
পর্ব ৬: খালিদ হত্যাকাণ্ড, ভুল আত্মসমর্পণ এবং ফাঁসির ফিনল গেমে ইতিএরশাদ শিকদারের অপরাধ জীবনের সবথেকে আলোচিত খুনের ঘটনা ছিল যুবলীগ নেতা খালিদ হত্যাকাণ্ড। ১৯৯৯ সালের ১৬ মে রাতে জেলা ছাত্রলীগ নেতা অসিদ বরণ বিশ্বাস, আবু হানিফ, আলী আকবর, ব্যবসায়ী সৈয়দ মনির ও তার ভাই চয়ন মীর এবং যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেনকে বরফকলে ডেকে আনা হয়। ঠান্ডা হাসিতে আপ্যায়নের পর শুরু হয় নাটকীয়তা। মুন্সি আইয়ুব একটা চকচকে রাইফেল নিয়ে এলে, এরশাদ রাইফেল হাতে নিয়ে মনিরের কানের পাশ দিয়ে তিনটে গুলি করে। বন্দুকের বাট দিয়ে পিটিয়ে খালিদকে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর বিশ কেজি ওজনের বরফ ভাঙার মুগুর দিয়ে হাত-পা থেতলে দেওয়া হয় এবং এরশাদ তার বুকের উপর লাফিয়ে পাজর ভেঙে দেয়!(এগুলো একদম সত্য) নির্যাতনে যুবলীগ নেতা খালিদ মারা যায় এবং তার লাশ ও গাড়ি সিমেন্টের বস্তায় ভরে ভৈরব নদে ফেলে দেওয়া হয়। তবে ভাগ্যের জোরে সৈয়দ মনির সেদিন বেঁচে যায়। খালিদ রুলিং পার্টির লিডার হওয়ায় এবং আইউইটনেস বেঁচে থাকায় এরশাদের উপর চারিদিক থেকে পলিটিক্যাল ও প্রশাসনিক প্রেসার মারাত্মক লেভেলে বেড়ে যায়। পরিস্থিতি খারাপ দেখে এরশাদ ভাবে সে নিজে গিয়ে পুলিশের কাছে সারেন্ডার করবে এবং পরে জামিনে বেরিয়ে আসবে—এই আত্নবিশ্বাস থেকে সে নিজে থেকেই পুলিশের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল!জেলখানার অন্ধকূপে যখন এরশাদ বুক ফুলিয়ে বের হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই তার পিঠে সবচেয়ে বড় ছুরিটা মারে নূর আলম তার নিজ বউয়ের সাথে এরশাদ এর নরপিশাচ আচারণ এর জবাব দেয়ার সুযোগ পায়। দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে নূর আলম সোজা পুলিশের কাছে গিয়ে এরশাদের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়! এরশাদের জীবনের প্রতিটি মার্ডারের নিখুঁত ডিটেইলস সে পুলিশ কমিশনার আনোয়ারুল ইকবালের কাছে ফাঁস করে দেয়। নূর আলমের রাজসাক্ষী হওয়া এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে উচ্চ আদালত ও রাষ্ট্রপতির কাছে করা ক্ষমার আবেদন রিজেক্ট হয়ে যায়। বাঁচার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলে এটি সে মেনে নিতে পারেনি জেলের সেলে টুথব্রাশ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হয়।অবশেষে আসে সেই ডেডলাইন—২০০৪ সালের ১০ই মে। খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। তিন জল্লাদ—শাহজাহান ভুইয়া, হাফিজউদ্দিন ও হারিস মিয়া ফাঁসি দিতে প্রস্তুত হন। মৃত্যুর মাত্র ১২ ঘণ্টা আগেও খাসি, মুরগি ও মাছ দিয়ে পেটপুরে ভাত খেয়েছেন সেই নরপিশাচ! রাত ১০টায় তাকে ফাঁসির কথা জানানো হলে হঠাৎ মৃত্যুর ভয়ে কালেমা পড়তে শুরু করেন তিনি। ২০০৪ সালের ১০ই মে রাত ১২টা বেজে ১ মিনিটে রুমাল ফেলা হয় এবং ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় খুলনার নরপিশাচ এরশাদ শিকদারকে। আধা ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখার পর মৃত ঘোষণা করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হাত ও পায়ের শিরা কেটে নিশ্চিত করা হয় সেই দানবের মৃত্যু।যে মানুষগুলো হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এরশাদের বুট জুতোর নিচে পাজর ভাঙার আর্তনাদ করেছিল, প্রকৃতির নির্মম ন্যায়ের দণ্ড একদিন তার নিজের পায়ের নিচ থেকেও ঠিক তেমনই এক ছটফটানির পাটাতন সরিয়ে দিল! এটি শতভাগ সত্য ঘটনা।

